বুধবার, ২৩ অক্টোবর, ২০১৯

বাংলাদেশের শিক্ষক অধ্যাপক আনিসুজ্জামান

বাংলাদেশের সামাজিক- সাংস্কৃতিক- ঐতিহাসিক- রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কোন প্রবাদপুরুষের নাম স্মরণ করলে যে নামটি আমাদের সামনে শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হয় তিনি অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান (জ.১৯৩৭)। বাংলাদেশের সাথে যে সামজিক , রাজনৈতিক ,সাংস্কৃতিক ঘটনাগুলো জড়িত আছে বিশেষত ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, ১৯৫২- এর ভাষা -আন্দোলন, ষাটের দশকে পূর্ব বাংলায় রবীন্দ্রচর্চা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণ-আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধসহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামানের নাম রক্তিম অক্ষরে জড়িয়ে আছে।
বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি একদিনে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বহু ঘাত -প্রতিঘাত,লড়াই- সংগ্রামে- ত্যাগে আমরা লাল-সবুজের একটি পতাকা, ‘আমার সেনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ নামে আমরা জাতীয় সঙ্গীত পেয়েছি, পেয়েছি ৫৬ হাজার বর্গমাইলের সুজল-সুফলাস-শস্য শ্যামলা আমাদেরই বাংলাদেশ। আমরা ব্রিটিশ শাসন ও শোষণের মাঝে ১৯০ বছর (১৭৫৭-১৯৪৭) অতিবাহিত করেছি আবার ধর্মীয় আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের সদস্য হয়েও অনেকটা অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদে ২৪ বছর অতিবাহিত করেছি। চব্বিশ বছরের মাঝেই একটি মুক্ত ভূ-খন্ড বিশ্ব মানচিত্রে অঙ্কন করা আমাদের পক্ষে সহজ ছিল না, এর জন্য আমাদের পাড়ি দিতে হয়েছে বন্ধুর পথ।
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ কর্তৃক প্রস্তাবিত ‘দ্বি-জাতি তত্ত¡’(১৯৩৯) উপর বিভাজিত ভারতবর্ষের নব্য সৃষ্ট পাকিস্তানে এক ধর্মীয় সাদৃশ্য ছাড়া পৃর্ব-পশ্চিম পাকিস্তানে ভাষা,সাহিত্য,জীবিকা ,জীবনাচারে কোন মিল ছিল না। নতুন রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার পরপরে রাষ্ট্রের বেসামরিক প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ উর্দুভাষী পশ্চিম পাঞ্জাবিরা নিয়ন্ত্রণ করতো। পশ্চিম পাকিস্তানিরা পূর্বপাকিস্তানিদের প্রতি (বাঙালিদের প্রতি) ব্যাপক অন্যায় অবিচার করে যার প্রথম বহিঃ প্রকাশ ‘জোর করে উর্দু ভাষাকে আমাদের প্রাণের ভাষা বাংলার উপর চাপিয়ে দেওয়া।’ কিন্তু যে রাষ্ট্রের ৫৬% মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহারিত ভাষা ছিল বাংলা যা হাজার বছর ধরে এ অঞ্চলের সাহিত্য- সঙ্গীত- লোকচর্যায় চর্চিত সে ভাষাভাষী মানুষের প্রতি এই জুলুম মেনে নেওয়া সহজ ছিল না। ফলে ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ‘ভাষা আন্দোলনে’ এদেশের ছাত্র-শ্রমিক -জনতা প্রাণের বিনিময়ে প্রাণপ্রিয় বাংলাভাষাকে রক্ষা করে। এই আন্দোলনের সাথে অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান সরাসরি জড়িত ছিলেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় আনিসুজ্জামান জগন্নাথ কলেজ (বর্তমান জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়ের ) উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির শিক্ষাথী ছিলেন। একে তো আনিসুজ্জামান একজন ভাষা আন্দোলনের প্রত্যক্ষ কর্মী অন্যদিকে হাসান হাফিজুর রহমান কর্তৃক সংকলিত একুশের সংকলনের (১৯৫৩) ভূমিকা লিখেন ষোল বছর বয়সী আনিসুজ্জামান। আজও সেই কিশোর ছেলে আনিসুজ্জামানের হস্তাক্ষর ব্যবহারিত হচ্ছে।
কিশোর অবস্থা থেকেই অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সাহিত্যপ্রীতি ছিল। আনিসুজ্জামান ১৯৫২ সালে কুমিল্লায় পূর্ববাংলা সাহিত্য সম্মেলনে অংশ নেন। ১৯৫৪ সালে আনিসুজ্জামান সাহিত্য সম্মেলনে সভাপতির ভাষণ রচনা করেন যেখানে তাঁর অভিনব সৃজন ও মননকর্মের বহিঃপ্রকাশ ঘটে ।
উপমহাদেশের বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী বুলবুল চৌধুরীর স্মৃতিবিজড়িত প্রতিষ্ঠান‘বুলবুল ললিতকলা একাডেমি(বাফা)’১৯৬৫ সালের ১৭ মে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় । সংক্ষেপে এটি বাফা (Bulbul Lalitakala Academy) নামে পরিচিত। এই একাডেমির সবচেয়ে বড় অবদান হল ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কারমুক্ত সংস্কৃতিচর্চাকে প্রাতিষ্ঠানিকরূপ দেওয়া।‘ এক সময় নৃত্যকলা সম্পর্কে মুসলিম সমাজের বিরূপ ধারণা ছিল। বুলবুল ললিত কলা একাডেমি সে ধারণাকে ভেঙ্গে দিয়ে নৃত্যকলাকে সবার নিকট গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।’ ১ অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ছিলেন বুলবুল ললিতকলা একাডেমির সর্বকনিষ্ঠ প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে শুদ্ধ বাংলা সংস্কৃতি বিকাশে অসামান্য অবদান রাখেন।
আনিসুজ্জামান শৈশবেই সরাসরি দেশভাগ প্রত্যক্ষ করেছেন এবং তিনি নিজে ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা দেশভাগের শিকার হয়েছেন। দেশভাগ পূর্ববর্তী ১৯৪৬ সালে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা কিশোর আনিসুজ্জামানের মনে দারুণ প্রভাব তৈরি করে। তাইতো বিশ্ববিদ্যালয়ে পি.এইচ.ডি- তে বিষয় হিসেবে নির্বাচন করেন ‘ইংরেজ আমলের বাংলা সাহিত্যে বাঙালি মুসলমানের চিন্তাধারা (১৭৫৭-১৯১৮)’ যা পরবর্তীতে কিঞ্চিৎ পরিবর্তিত হয়ে ‘মুসলিম-মানস ও বাংলা সাহিত্য’ (১৯৬২) শিরোনামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। কেন এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয়কে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বিষয় হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন সে সম্পর্কে অধ্যাপক ড. ভীষ্মদেব চৌধুরী তাঁর এক লেকচারে বলেন ,
‘সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের সদস্য হয়েও আনিসুজ্জামান কৈশরে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা, দেশভাগের তিক্ত অভিজ্ঞতা লাভ করেন। সামাজিক পারিপাশির্^ক সে অবস্থা অবলোকন করে অর্জিত অভিজ্ঞতাকে তিনি পি.এইচ.ডি বিষয় হিসেবে গ্রহণ করেন।^২
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,বাঙালি’র জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যিনি তাঁর বহুমাত্রিক সৃজনের মধ্যদিয়ে ভারতবর্ষের মানুষকেই নয় বরং বৈশ্বিক মানুষদেরও সমৃদ্ধ করেছেন।এই মানুষটিকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত বলে বেতারে তাঁর রচিত সংগীত নিষিদ্ধ করে। পাকিস্তানে রবীন্দ্র-জন্মশতবার্ষিকী পালনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কিন্তু এদেশের সুধীমহল তা ইতিবাচক ভাবে গ্রহণ করেনি। দেশবরণ্য ব্যক্তিদের লেখা সংগ্রহ করে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ‘রবীন্দ্রনাথ’(১৯৬৮) শিরোনামে গ্রন্থ প্রকাশ করে শাসকশ্রেণির গালে চপেটাঘাত করেছেন তা কেবল দুঃসাহসিক কর্মই নয় বরং বাংলা ভাষা-সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ছিল।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় জীবনের এক রঙ্কিম অর্জন। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমেই আমরা একটি দেশ পেয়েছি, পৃথিবীর অন্যান্য স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র গুলোর মত আমরাও একটি মানচিত্র পেয়েছি। এই প্রাপ্তি আমাদের জন্য সহজ ছিল না। তার জন্য ৩০ লক্ষ মানুষকে শহিদ হতে হয়েছে, ২ লক্ষ নারীর সম্ভ্রম বিসর্জন দিতে হয়েছে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান অসামান্য অবদান রাখেন।১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল গঠিত প্রবাসী সরকারের (মুজিবনগর সরকারের) পরিকল্পনা সেলের সদস্য ছিলেন। মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাজউদ্দিন আহমেদ যে ভাষণগুলো পাঠ করতেন তার অনেকগুলো অধ্যাপক আনিসুজ্জামান নিজে লিখে দিতেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর সাথে যে শিক্ষক প্রতিনিধির সাক্ষাত হয় সেখানে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন।
‘‘আব্বা বললেন, স্বাধীন বাংলা বেতার-কেন্দ্র থেকে যেদিন তিনি শোনেন যে , ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎকারী বাংলাদেশের শিক্ষক-প্রতিনিধিদলে আমি ছিলাম ,সেদিন নিজেদের নিরাপত্তার জন্যে ভয় না পেয়ে তাঁর বরঞ্চ খুব গর্ব হয়েছিল এই ভেবে যে , তাঁর ছেলে দেশের জন্য কিছু করছে।’’^৩
এর মধ্যদিয়ে আমরা এক দেশপ্রেমিক আনিসুজ্জামানকে আবিষ্কার করতে পারি।
বাংলাদেশের সামাজিক- সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক আন্দোলনে নিজেকে কেবল সীমাবদ্ধ রাখেননি বরং দেশ পুনঃগঠনেও অংশ নিয়েছেন। নব্যদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি,’ নজরুল সংগীত ‘চল্ চল্ চল্’-কে রণসংগীত করতে তিনি সমর্থন দেন। একটি রাষ্ট্রের দলিল হল তার সংবিধান, বাংলাদেশের সংবিধানের গর্বিত বাংলা অনুবাদক হলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫৩ এর (৩) অনুচ্ছেদে লেখা আছে,
১৫৩। (৩) এই অনুচ্ছেদের (২) নম্বর দফা অনুযায়ী সার্টিফিকেটযুক্ত কোনো পাঠ এই সংবিধানের বিধানবলীর চূড়ান্ত প্রমাণ বলে গণ্য হবে।
তবে শর্ত হলো, বাংলা ও ইংরেজি পাঠের মধ্যে বিরোধের ক্ষেত্রে বাংলা পাঠ প্রাধান্য পাবে।^৪
নব্য সৃষ্ট বাংলাদেশে বিজ্ঞান ও প্রগতি নির্ভর শিক্ষা কমিশন ‘কুদরত-ই-খুদা শিক্ষা-কমিশন-১৯৭২’-এর সদস্য ছিলেন।
১৯৯১ সালে যখন যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমের বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বাতিলের দাবিতে এদেশের বুদ্ধিজীবী সমাজ শহিদ জননী জাহানার ইমামের নেতৃত্বে প্রতীকী আদালত প্রতিষ্ঠা করে, সেই আদালতে গোলাম আজমের বিরুদ্ধে ১ নং ফরিয়াদি (বাদী) ছিলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। এর ফলে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় আসামী হয়ে গ্রন্থাগার-গবেষণা-শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে তাকে হাজিরা দিতে হয়েছিল আদালতের কাঠগড়ায়।৫
মহান মুক্তিযুদ্ধে যে আলবদর,আল শামস্,শান্তিবাহিনী যুদ্ধাপরাধে লিপ্ত ছিল তাদের বিচারের নিমিত্তে প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২০০৯,অন্যতম যুদ্ধাপরাধী সাকা চৌধুরী’র অপরাধ কর্মের জন্য তার বিপক্ষে সাক্ষ্য দেন আনিসুজ্জামান। এই জঘন্য মানুষগুলোর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েই কেবল জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করেননি বরং তরুণ সমাজের কাছে এক পাপহীন বাংলাদেশ উপহার দেন।
বহুমাত্রিক কর্মময় জীবনের অধিকারী আনিসুজ্জামান আজ দেশের সীমানা পেরিয়ে বৈশি^ক বিবেকে পরিণত হয়েছেন। বাংলাদেশের সকল রাষ্ট্রীয় সম্মান অধিকারী এই মানুষটি ভারত সরকার কর্তৃক ‘পদ্মভূষণ’ উপাধি লাভ করেন। যে অসাম্প্রদায়িকতা ও শুদ্ধ গণতন্ত্রের জন্য যে লড়াই আনিসুজ্জামান সেই শৈশব থেকে আজ পর্যন্ত করে যাচ্ছেন সেই অসাম্প্রদায়িকতা ও শুদ্ধ গণতন্ত্র আজও আমরা শতভাগ প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। জীবন সায়াহ্নে এসেও তাঁকে পুলিশি পাহাড়ায় চলাফেরা করতে হয়। কিন্তু আশি বছর পরেও আনিসুজ্জামান ছুটে চলেন বাংলাদেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে, বক্তৃতা-লেখনিতে এখনো সমাজের অসঙ্গতির বিরুদ্ধে কথা বলেন, প্রতিবাদ করেন, আন্দোলন করেন। জাতির বিবেক অধ্যাপক আনিসুজ্জামান আজও স্বপ্ন দেখেন এই বাংলাদেশ হবে বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাশিত 'সোনার বাংলা' যা হবে ক্ষুধামুক্ত, সাম্প্রদায়িকতামুক্ত, সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক এক রাষ্ট্র। হাজার বর্ষ পরেও যখন কেউ বাংলাদেশের ভাশা-সাহিত্য-ইতিহাস- ঐতিহ্যের শেকড় সন্ধান করবেন তখন জাতির বিবেক অধ্যাপক আনিসুজ্জামান জ্বল জ্বলে তারকা হয়ে থাকবেন।
তথ্যসূত্রঃ
১. মুহাম্মদ আবদুল হাই, বুলবুল ললিতকলা একাডেমী,বাংলাপিডিয়া।
২. অধ্যাপক ড. ভীষ্মদেব চৌধুরী, বাংলাদেশের সংস্কৃতিঃ অধ্যাপক আনিসুজ্জামান পাঠ, পঞ্চম লেকচার , বাংলার পাঠশালা আয়োজিত,ঢাকা,(২০.১০.২০১৮)
৩. নতুন যুগের ভোরে, পুনঃপাঠঃ সাহিত্য-সংস্কৃতি-জাতীয় চেতনা প্রসঙ্গে আনিসুজ্জামান, বাংলাদেশের শিক্ষক আনিসুজ্জামান, শব্দঘর, পঞ্চম বর্ষশুরু সংখ্যা,জানুয়ারি ২০১৮।
৪. ১৫৩। (৩) এই অনুচ্ছেদের (২) নম্বর দফা, বাংলাদেশের সংবিধান।
৫. সরকার সোহেল রানা, আনিসুজ্জামান কেন আনিসুজ্জামান, বাংলাদেশের শিক্ষক আনিসুজ্জামান, শব্দঘর, পঞ্চম বর্ষশুরু সংখ্যা,জানুয়ারি ২০১৮।
আনাছ আল জায়েদ,শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

বৃহস্পতিবার, ১৭ মে, ২০১৮

তিতাস একটি নদীর নাম


নদীনির্ভর বাংলা কথান্যাসের ধারায় অদ্বৈত মল্লবর্মণের (১৯১৪-১৯৫১) লেখা আঞ্চলিক উপন্যাসতিতাস একটি নদীর নাম’(১৯৫৬) অর্জন করেছে বিশিষ্টতাতিতাস একটি নদীর নামউপন্যাসের মাধ্যমে তিনি নির্মাণ করেছেন জল ও জীবনের ঐকতান আর এই ঐকতানে অদ্বৈত মল্লবর্মণ নিম্নবর্গের প্রবাহমানতার শাশ্বত প্রতিনিধি হিসেবেবাসন্তীচরিত্রটি নির্মাণ করেছেন

বাংলা সাহিত্যে নদীকেন্দ্রিক আরো আঞ্চলিক উপন্যাসগুলো হল মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়েরপদ্মা নদীর মাঝি’(১৯৩৬), হুমায়ূন কবিরেরনদী ও নারি’(১৯৩৬), বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়েরইছামতি’(১৯৫০), সমরেশ বসুরগঙ্গা’(১৯৫৭) উল্লেখযোগ্য

তিতাস- তীরের গোকর্ণ গ্রামের যে পাড়ায় অদ্বৈতের বেড়ে ওঠা, ভদ্রভাষায় তার নামমালোপাড়াহলেও সেটি ভদ্রসমাজেগাবরদের পাড়াবলে বহুল পরিচিত এই নিয়ে সমালোচক বলেন,
    
শ্রমজীবী আন্তেবাসী জেলে সম্প্রদায়ের প্রতি অবজ্ঞা থেকেই লোকেরা এই নাম সৃষ্টি করেছেন আর এই প্রাকৃত জীবন কৌম সমাজ সংস্কৃতিকে ভালোবেসে লেখেন তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসটি’’^

তিতাস নদী থেকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা একদল জেলে সম্প্রদায়ের(মালো সমাজ) জীবন নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন ঔপন্যাসিক। মালোদের জীবনের এক সমগ্রিক চালচিত্র তুলে ধরা হয়েছে এই উপন্যাসে। প্রতিটি মালো নর-নারীর ব্যক্তিগত জীবন, তাঁদের গোষ্ঠী জীবনের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য এবং তিতাসের উপর নির্ভরশীল মালোদের জীবন ও জীবিকার পুঙ্খানুপুঙ্খ পরিচয় ধরা পড়েছে এই উপন্যাসে।

‘ তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসটি নিবিড় পাঠ করলে আমরা এর মাঝে একটা বিষণ্ণতার ছোঁয়া তথা একটা ট্র্যাজিক সুর ফুটে উঠতে দেখি। যার মূলে রয়েছে জীবনের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির চিরকালীন দ্বন্দ্ব। আর সমগ্র উপন্যাস জুড়ে যে চরিত্রটি জীবনযুদ্ধে, স্বয়গোষ্ঠীর ঐতিহ্য- সংস্কৃতি রক্ষায় একাই লড়াই করেছে সে বাসন্তী।

‘তিতাস একটি নদীর নামউপন্যাসের নায়িকা বাসন্তী যার শইশব কৈশোর গড়ে উঠেছে কিশোর আর সুবলের সাথে যদিও বাসন্তীর মনের দুর্বলতা কিছুটা কিশোরের প্রতি ছিল মৎস্য শিকারের উদ্দেশ্যে রওনা হবার আগেই বাসন্তীর সাথে তাঁর বিবাহ স্মির হয়েছিল; কিন্তু বাসন্তীকে বিবাহ করতে চায়নি কিশোর কিশোরের মতে,

বিবাহ তাকেই করা যায়, যার সাথে কোনদিন কোন পরিচয় থাকে না……নতুন করে মন তাঁকে চিনবে, জানবে, তাতেই মনের সুখ’’
-   
তাই কিশোরকে নিয়ে ঘর করার স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি বাসন্তীর।
কিশোরের সাথে বাসন্তীর বিবাহ স্মির হলেও সুবল বাসন্তীকে মনে মনে ভালোবাসতো তাই যে মুহূর্তে সে কিশোরের কাছে জানতে পারে কিশোর বাসন্তীকে বিবাহ করতে চায় না সেই মুহূর্তে সুবলের মনে মনে আশার সঞ্চার হয়।

“সকল কথা শুনিয়া সুবল আনন্দে লাফাইয়া উঠিয়া বলে,
 ‘ দাদা, তা হইলে বাসন্তীরে তুমি এখানেই পাইয়া গেলা। অখন দেশের বাসন্তীরে কার হাতে তুইল্যা দিবা কও’
‘ তোর হাতে দিলাম’
সুবলের মনে একটা আশার রেশ গুনগুন করিয়া উঠে”

বিবাহের পর বাসন্তী আর সুবলের দীর্ঘদিন আর ঘর বাঁধা হয়নি। নৌকা চাপা পড়ে নৃশংস ভাবে প্রাণ হারায় সুবল আর বিধবা হয় বাসন্তী। আর এই তিক্ত জীবন অভিজ্ঞতা বাসন্তীর পুরুষ সমাজের প্রতি বিশ্বাস নষ্ট করে দিয়েছে।

“পুরুষ মানুষ দিয়া কি হইব? তাঁরা বৃষ্টির পানির ফোঁটা, ঝরলেই শেষ। তাঁরা জোয়ারের জল, তিলেক মাত্র সুখ দিয়া নদীর বুক শুইষ্যা নেয়’’।

একজন বিধবা নিঃসঙ্গ নারীর জীবনে বাঁচার একমাত্র অবলম্বন হল তাঁর সন্তান। নিজের সন্তান না হওয়ার পরেও অনন্তের মাঝে সুপ্ত জননী সত্তা খুঁজে পেয়েছিল বাসন্তী।

“ মাসি ডাকে আকৃষ্ট হইয়া সুবলার বউ চকিতে ঘাড় ফিরাইয়া দেখিল, তারপর সে উদ্দাম হইয়া বলিয়া উঠিল, অনন্ত? আমার অনন্ত!’’

আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে অনন্তের সাথে বাসন্তীর ‘ অস্তিত্ব সংকট’ দেখা যায়-

“ তুইও কি আমার পর হইয়া গেল অনন্ত?’’

মালোদের নিজস্ব কালচার বলতে ছিল ভাটিয়ালি গান, কীর্তন গান সহ নানা লোক সংগীত। কিন্তু কালের বহমানে বাহিরে থেকে আসা শাহরিক  যাত্রাদল এর স্থান দখল করে। মালোদের নিজের সংস্কৃতিকে রক্ষার জন্য বাসন্তী ও মোহনের সংগ্রাম ব্যর্থতায় পরিণত হয়।

“মাত্র দুটি নরনারী গেল না। তাঁরা সুবলার বউ আর মোহন। অপমানে সুবলার বউ বিছানায় পড়িয়া রহিল আর বড় দুঃখে মোহনের দুই চোখ ফাটিয়া জল আসিতে লাগিল’’।

 সার্বিক ভাবে আমরা বলতে পারি, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির দ্বন্দ্বে বাসন্তী চরিত্রটির ট্র্যাজিক পরাজয় হয়েছে।


 আনাছ আল জায়েদ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় 











শুক্রবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০১৭

দর্শন ও বিজ্ঞান


আপাতদৃষ্টিতে দর্শন ও বিজ্ঞান পরস্পর বিসদৃশ মনে হলেও প্রকৃত প্রস্তাবে এদের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক খুবই নিকট ও নিবিড়। দর্শন ও বিজ্ঞানের মাঝে এই নিবিড় সম্পর্ক বিষয়ে সুস্পষ্ট ধারণা পেতে হলে উভয়ের স্বরূপ সম্বন্ধে আমাদের পরিষ্কার ধারণা থাকা প্রয়োজন।

বিজ্ঞানের স্বরূপ

ব্যাপক অর্থে যা অজ্ঞানের অতীত তাই বিজ্ঞান। এ মতে যে বিষয়ের জ্ঞান সুনিয়ন্ত্রিত, এলোমেলো বা ইতস্তত বিক্ষিপ্ত নয় তাকেই বলে বিজ্ঞান। বিজ্ঞান বস্তু বা ঘটনা রাশির প্রকৃত জ্ঞান লাভ করতে চায়। আর এই উদ্দেশ্যে সে প্রকৃতির বুকে পরীক্ষা- নিরীক্ষা চালিয়ে সুশৃঙ্খল, সুনির্দিষ্ট ও সুসংহত জ্ঞান লাভে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে চলছে। নিরপেক্ষ দৃষ্টি ও ক্রমিক সত্য আবিস্কারের প্রচেষ্টা বিজ্ঞানের একটি অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য। বিজ্ঞানের অন্য একটি বৈশিষ্ট্য হল সে শুধু তত্ত্ব প্রচার করেই ঝিমিয়ে পড়ে না, মানুষের জীবন- যাত্রায়ও যে আমূল পরিবর্তনের চেষ্টা করে। এতেই বিজ্ঞানের সত্যিকার সার্থকতা।

দর্শন ও বিজ্ঞানের সাদৃশ্য

সভ্যতার ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় অতীতে এমনও সময় ছিল যখন দর্শন ও বিজ্ঞানের মধ্যে আদৌ কোন সীমারেখা ছিল না। দর্শন ও বিজ্ঞান তখন একই আসনে অধিষ্ঠিত ছিল। পদার্থ বিজ্ঞানের (Natural Philosophy) নামে অভিহিত করা হতো। এই কিছুদিন আগেও মনোবিজ্ঞানও দর্শনের আওতাভুক্ত ছিল। আজকের রাজনীতির বিষয় “রাষ্ট্রবিজ্ঞান” পূর্বে “রাষ্ট্রদর্শন” নামে পরিচিত ছিল।
এর কারণ হচ্ছে, দর্শন ও বিজ্ঞানের বিষয়বস্তু মূলত এক ও অভিন্ন। দর্শন ও বিজ্ঞান উভয়ের জীবন ও জগতের রহস্য উদঘাটন করতে চায়। জটিল বিষয়কে সহজ করা, অজানা বিষয়কে জানা, দুর্বোধ্য বিষয়কে সুবোধ্য করা উভয়ের লক্ষ্য। উভয়ের মূলে রয়েছে সত্যানুসন্ধানের অপ্রতিহত বাসনা । তাই জগত ও জীবনের ব্যাখ্যা হিসেবে দর্শন ও বিজ্ঞান একই পথের যাত্রী।

দর্শন ও বিজ্ঞানের মাঝে পার্থক্য

আলোচ্য বিষয়, লক্ষ্য ও উদ্দ্যশ্যের দিক থাকে দর্শন ও বিজ্ঞান একই পথের যাত্রী হলেও যাত্রার বাহনে, অর্থাৎ পদ্ধতি ও পরিণতির দিক থেকে তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিষয়ে পার্থক্য রয়েছে।


এক. দর্শনের দৃষ্টিভঙ্গি হল অখণ্ড বা সার্বিক। কিন্তু বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি হল খণ্ডিত বা বিশেষ। দর্শন সমগ্র বিশ্বজগৎ নিয়ে আলোচনা করে। মানবজীবনের সকলদিক দর্শন আলোচনা ক্রে।কিন্তু বিজ্ঞান বিশ্ব জগতের এক একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করে।

দুই. পদ্ধতিগত দিক থেকেও দর্শন ও বিজ্ঞানের মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান। দর্শনের পদ্ধতি হল যৌক্তিক ও বিশ্লেষণধর্মী। বিজ্ঞানের পদ্ধতি হল অভিজ্ঞতা ভিত্তিক। পর্যবেক্ষণ, পরীক্ষণ ও আরোহী পদ্ধতির সাহায্যে বিজ্ঞান তাঁর আলোচ্য বিষয়বস্তু ব্যাখ্যা করে।

তিন. দর্শন বস্তুর পরিমাণগত ও গুণগত দিক নিয়ে আলোচনা করে কিন্তু বিজ্ঞান কেবল বস্তুর পরিমাণগত দিক নিয়ে আলোচনা করে।দর্শন বস্তুর গুণগত দিক নিয়ে আলোচনা করে বলেই সে মূল্যায়নধর্মী। আর পরিমাণগত দিক নিয়ে বিজ্ঞান আলোচনা করে বলে বিজ্ঞান বর্ণনাধর্মী।

চার. যে কোন দার্শনিক সিদ্ধান্ত সর্বজনীন ও সুনির্দিষ্ট নয়। কিন্তু বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত সর্বজনীন ও সুনিশ্চিত।দার্শনিক ব্যাখ্যায় সত্যতা পরীক্ষা- নিরীক্ষা দ্ধারা যাচাই করা যায় না।

পাঁচ. বিজ্ঞান মানবমনকে পরিতৃপ্ত করতে পারে না। কিন্তু দর্শন সত্য, সুন্দর এবং মঙ্গল এই প্রতিটি আদর্শ নিয়ে আলোচনা করে বলেই সে মানবমনকে পরিতৃপ্ত করতে পারে।


শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭

মহাভারতের দুই মাতা


মহাভারত যখন লিখিতরূপ পায়(খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দী থেকে)তাঁর আগে থেকে নারীর স্বাধীনতা শৃঙ্খলাবদ্ধ হতে থাকে। নারীর স্বাধীনতা যুগের অনেকটা অবসান ঘটলেও থাকে তাঁর অবশেষ।এ কারণে মহাভারতের নারীদের বিভিন্ন পরিবেশ পরিস্থিতিতে জ্বলে উঠতে দেখা যায়।

মহাভারতের প্রধান  দুইমাতা চরিত্র হল- গান্ধারী, কুন্তী  । এই দুই শক্তিশালী নারী চরিত্র মহাভারতে নতুন প্রাণ দিয়েছে। তাঁদের ত্যাগ, সাহসিকতা, স্বামীভক্তি, ব্যক্তিত্ব মহাভারতের কাহিনিকে সমৃদ্ধ করেছে।


গান্ধারী

গান্ধারী গান্ধার রাজকন্যা। পিতা গান্ধারাজ তাঁর অজ্ঞাতে হস্তিনাপুরের রাজপুরুষ অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের সাথে বিয়ে দেন। গান্ধারী নির্লোভ, জ্ঞানী, দূরদর্শিনী ছিলেন। মহাভারতের কবি তাঁকে জ্ঞানবতী (সভাপর্বে)বলেছেন। স্বয়ং ধৃতরাষ্ট্র তাঁকে দূরদর্শিনী (উদ্ যোগ পর্বে) এবং সার্বিক জীবনাচরণে তিনি সংযত ও সংযমী ছিলেন এ কারণে তাঁকে ‘ব্রহ্মচারিণী’(স্ত্রী পর্বে) বলা হয়েছে।

গান্ধারী পিতা এবং স্বামী উভয়ের বিরুদ্ধে তীব্র অভিমানে আহত হয়েছেন। স্বামী অন্ধ জানার পর তিনি নিজেও চোখে কাপড় বেঁধে অন্ধত্ব বরণ করেছেন। তিনি জানতেন ক্ষত্রিয় বিঁধানে স্বামীকে অতিক্রম করা যায় না।

দুর্যোধন –কর্ণ-শকুনি সাথে পুনর্বার দূতিক্রিড়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, ধৃতরাষ্ট্রের দুর্বলতা গান্ধারীর অজানা ছিল না। তাই এই সর্বনাশা ষড়যন্ত্রের শিকার না হবার জন্য তীব্র ভাষায় ধৃতরাষ্ট্রকে সর্তক করে বলেছেন,
           
                   “ মহারাজ তুমি, নিজের দোষে দুঃখের সাগরে নিমগ্ন হয়ো না। নির্বোধ অশিষ্ট পুত্রদের কথা শোন না। পাণ্ডবরা শান্ত হয়েছে, আবার কেন তাঁদের ক্রুদ্ধ করছ? তুমি স্নেহাবশে দুর্যোধনকে ত্যাগ করতে পারনি, এখন তাঁর ফলে সর্বনাশ হবে’’।
                               (সভাপর্ব)

দুর্যোধন কর্তৃক কৃষ্ণের সন্ধির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হলে, গান্ধারী দুর্যোধনকে তিরস্কার করে বলেন,
                
                 ‘পুত্র আমার পিতা ও ভীষ্ম দ্রোনাদি সুহ্রদগণের কথা রাখ। রাজত্বের অর্থ মহৎ প্রভুত্ব তা কোন দুরাত্মারা এই পদ কামনা করতে পারে না। পাণ্ডবগণ ঐক্যবদ্ধ মহাবীর, তাঁদের সাথে মিলিত হলে তুমি সুখে পৃথিবী ভোগ করতে পারবে।বৎস, ভীষ্ম দ্রোণ যা বলেছেন তা সত্য, কৃষ্ণার্জুন অজেয়’।
                                      (উদ্ যোগ পর্ব)

মহাভারতের কাহিনিতে প্রথম থেকে গান্ধারী সত্য, ন্যায় আর কল্যাণের পথে ছিলেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধকালে, দুর্যোধন প্রতিদিন মায়ের কাছে আশীর্বাদ চেয়েছেন আর তাঁর উত্তরে মা গান্ধারী বলেছেন,

               ‘যে পক্ষে ধর্ম সেই পক্ষেই জয় হবে’।
                                           (স্ত্রী পর্ব)

জ্ঞানী গান্ধারী জানতেন দুই কুলের মধ্যমণি কৃষ্ণ এই ভয়াবহ যুদ্ধ থামাতে পারতেন কিন্তু থামান নি। তাঁকে অভিশাপ দিয়ে বলেছেন,
    
              “ মধুসূদন তুমি কেন এই যুদ্ধ হতে দিলে?তুমি যখন কুরুপাণ্ডব জ্ঞাতিদের বিনাশ অপেক্ষা করছো, তখন তোমার জ্ঞাতিগণকেও তুমি বিনষ্ট করবে’’।
                          (স্ত্রী পর্ব)


কুন্তী


জন্মের আগেই কুন্তীর ভাগ্য নির্ধারণ হয়ে গিয়েছিল। তাঁর পিতার নাম শূরসেন এবং স্বামীর নাম পান্ডু। অঙ্গরাজ কর্ণ, ইন্দ্রপ্রস্থের অধিপতি যুধিষ্ঠির, ভীম এবং অর্জুন তাঁর পুত্র। যমজ সহদর নকুল ও সহদেব তাঁর সতীন মাদ্রীর গর্ভে জন্মালেও কুন্তী তাঁদের নিজ সন্তানদের মত ভালোবাসতেন।

কুন্তী যখন কুমারী ছিলেন তখন তাঁর গৃহে দুর্বাসামুনি অতিথি হয়ে আসে এবং কুন্তী তাঁকে সেবা দ্বারা সন্তুষ্ট করেন। এতে খুশি হয়ে দুর্বাসামুনি তাঁকে এক অদ্ভুত বর দেন। বর পেয়ে কৌতূহলী কুন্তী কুমারী অবস্থায় সূর্যদেবকে কামনা করে বসেন এবং সূর্যদেবের সাথে মিলিত হয়ে এক পুত্র জন্ম দেন যাকে পরবর্তীতে যমুনার জলেতে ভাসিয়ে দেন। এই পুত্র পরবর্তীতে কর্ণ নামে পরিচিত হন।

পাণ্ডু ও মাদ্রীর মৃত্যুর পর কুন্তী নিজের ও মাদ্রীর ছেলেদের নিয়ে হস্তিনাপুরে আসেন।নিজ পুত্র ও মাদ্রী পুত্রের মাঝে কোন ভেদ করেননি। সমান আন্তরিকতায় সবাইকে ভালোবেসেছেন। মায়ের এই গুন পরবর্তীতে যুধিষ্ঠিরকে পেয়েছিল। বন পর্বে, যজ্ঞ তাঁকে মৃত ভাইদের মাঝে যেকোন একজনকে জীবনদান করতে চাইলে যুধিষ্ঠির নকুলের জীবন প্রার্থনা করেন।
  
                ‘ কুন্তী ও মাদ্রী দুজনেই আমার পিতার স্ত্রী, এদের দুজন পুত্র জীবিত থাকুক এই আমার ইচ্ছা, মাতা কুন্তীর পুত্র হিসেবে আমি জীবিত আছি আর মাতা মাদ্রীর একজন পুত্র জীবিত থাকুক এই আমার ইচ্ছা। আমি দুই মাতাকেই তুল্যজ্ঞান করি’।
                                         (বন পর্ব)


যুধিষ্ঠির রাজ্যগ্রহণের পর কুন্তী তাঁকে উপদেশ দেয়,
            
     ‘যুধিষ্ঠির তুমি কখনও সহদেবের উপর অপ্রসন্ন হয়ো না, সে তোমার ও আমার অনুরক্ত। কর্ণকে সর্বদা স্মরণ করে, সর্বদা সকলে দ্রৌপদীর প্রিয় সাধন করবে। কুরুকুলের ভার তোমার উপরই পড়েছে’।

সার্বিক ভাবে, মাতৃস্নেহের দুই প্রতিচ্ছবি মাতা গান্ধারী ও মাতা কুন্তী মানবীয় আচরণ হাজার বছর ধরে বয়ে চলেছে ভারতীয় নারীরা। ব্যক্তিগত দোষ ত্রুটি থাকতে পারে কিন্তু মাতৃস্নেহে সবাই এক।







                               

বৃহস্পতিবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০১৭

ভারতীয় দর্শন


প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে আধুনিক বিজ্ঞান প্রভাবিত যুগ পর্যন্ত ভারতবর্ষের ঋষি -মুনি যোগী- সন্ন্যাসী জীবন জগতের মৌলিক প্রশ্নাবলী নিয়ে যে চিন্তা ভাবনা করেছেন তাঁদের সমন্বিত রূপকে বলা হয় ভারতীয় দর্শন

সভ্যতার সেই ঊষালগ্ন থেকেই ভারতীয় মনীষীরা জগতের স্বরূপ কি? জগতের মাঝে মানুষের অধিষ্ঠান কি রূপ, ভালো-মন্দের মাপকাঠি কীসে, বেঁচে থাকার সার্থকতা কোথায়, মানুষের আদিবাস কোথায় তাঁর স্বরূপ কি, সে-জগতের সাথে জগতের সম্পর্ক কি, স্রষ্টা বলে যাকে আমরা স্বীকার করি তাঁর স্বরূপ কি?জীবনের লক্ষ্য কি? মানুষের চারদিকে এত দুঃখ- দুর্দশা কেন?কীভাবে মানুষ এই চক্রায়িত দুষ্ট বলয় থেকে মুক্তি পেতে পারে? ধর্ম- অর্থ- কাম- মৌক্ষ এই চারটি জীবনাদর্শের মাঝে কোনটি মানুষের জন্য সর্বোত্তম কাম্য- জাতীয় মৌলিক প্রশ্নের যথার্থ অনুসন্ধান করে ভারতীয় দর্শন
 বেদকে কেন্দ্র করে ভারতীয় দর্শনের উৎপত্তি ঘটেছে বলে মনে করে আধুনিক পণ্ডিতরা আধুনিক বিদ্বানদের মতে, বেদ হচ্ছে ভারতের প্রাচীন সাহিত্য, সংস্কৃতি, চিন্তাধারা দর্শনের একমাত্র ধারক বাহক
আধুনিক বিদ্বানদের মতে, ভারতীয় দর্শনের বিবর্তনের ইতিহাস এক অনন্য বিশিষ্টয়ের অধিকারী। ভারতীয় দার্শনিকরা দর্শনকে কেবল তত্ত্বালোচনার মাঝে সীমাবদ্ধ রাখেন নি বরং তাঁদের কাছে দর্শন হল জীবনকে যথার্থভাবে পরিচালিত করা।

একজন ভারতীয় দার্শনিক প্রথমে প্রতিপক্ষের বক্তব্য শ্রদ্ধার সাথে শ্রবণ করেন, তারপর প্রতি পক্ষের বক্তব্য খণ্ডন করেন এবং সবশেষে নিজের বক্তব্য হাজির করেন।

ভারতীয় দর্শন বিকাশের শ্রেণিবিভাগের সময়।
১. খ্রিষ্টপূর্ব     ১৬০০- ১৫০০ = বৈদিক যুগ
২. খ্রিষ্টপূর্ব      ৬০০-২০০ =  মহাকব্যের যুগ
৩. খ্রিষ্টপূর্ব   ২০০ থেকে শুরু = সূত্র- সাহিত্যের যুগ
৪. খ্রিষ্টপূর্ব   ২০০ থেকে শুরু = পাণ্ডিত্যের যুগ।


ভারতীয় দর্শনের সাধারণ বৈশিষ্ট্য

কোন বিশেষ দেশের দার্শনিক চিন্তার  বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে আমরা সে দেশের ভৌগলিক অবস্থান, পারিপার্শ্বিক অবস্থা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে পারি। ভারতীয় দর্শনের বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে আমরা ভারতবর্ষের সাম্যক অবস্থা সম্পর্কে জানতে পারি।

ভারতবর্ষ প্রধানত একটি কৃষি প্রধান দেশ। ভারতবর্ষ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। এই সৌন্দর্যই সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে অদ্যাবধি স্বদেশি ও বিদেশি পর্যটক ও পরিব্রাজকদের কাব্যিক ও দার্শনিক দৃষ্টি আকৃষ্ট করতে সমর্থ হয়েছে।

এক- সম্প্রদায় নির্ভরতা

যে সকল সম্প্রদায়ের উদ্ভব ভারত বর্ষে ঘটেছে তারাই পরবর্তীতে বিকশিত হয়েছে। কোন দার্শনিক ব্যক্তি- সত্বার দাবি করেননি। প্রত্যেকই কোন না কোন সম্প্রদায়ের সমর্থক। তাই নতুন কথাগুলোও তাঁরা পুরাতনের মত সমর্থন করে গেছেন। তাই ভারতীয় দর্শন একান্তভাবে সম্প্রদায় নির্ভর।

দুই- অতীতনির্ভর

ভারতীয় দর্শন অতীতকে বাদ দিয়ে সামনের দিকে এগুতে পারেনি। একারণেই ভারতীয় দর্শনের আধুনিক ব্যাখ্যায়ও প্রাচীন, এমনকি সভ্যতার আদিপর্বের বহু ধ্যান ,ধারনা ও সংস্কারের মিশ্রণ লক্ষ করা যায়। অতীত নির্ভর বলেই ভারতীয় দার্শনিকের তথাকথিত অভিনব তত্ত্বে উপনীত হওয়ার পরিবর্তে প্রাচীন তত্ত্বের কাঠামোর মধ্যেই নিজেদের মতবাদকে সীমাবদ্ধ রেখেছেন।

তিন- সূত্র নির্ভরতা

ভারতীয় দর্শনের অপর একটি বৈশিষ্ট্যের মাঝে সূত্র সাহিত্যের উপর অধিক নির্ভরশীল হওয়া। ভারতীয় দর্শনের প্রচলিত ইতিহাসে এই পর্যন্ত যে সকল সম্প্রদায়ের উল্লেখ পাওয়া যায়, তাঁদের সবার মূলগ্রন্থেই এক একটি সূত্র সংকলনের অস্তিত্ব দেখা যায়।

চার- রচনা শৈলীর বিশিষ্টতা

রচনা শৈলীর স্বকীয়তা ভারতীয় দর্শনের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এখানকার দার্শনিকদের রচনারীতি তিনটি ক্রমে বিন্যস্ত। যথা. পূর্বপক্ষ, নিরাকরণ ও সিদ্ধান্ত। এখানে প্রথমে প্রতিপক্ষের মতকে শ্রদ্ধার সাথে শ্রবণ করা হয়, যুক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষের মতের নিরাকরণ করা হয় এবং সবশেষে নিজের সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠা করা হয়।

পাঁচ- ধর্মের সাথে দর্শনের সংযোগ

ভারতীয় সংস্কৃতিতে ধর্ম ও দর্শনের এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক লক্ষ্য করা যায়। কিছু কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া প্রায় অধিকাংশ সম্প্রদায়ই ধর্ম আর দর্শন এক চোখে দেখেছে। ভারতীয় দার্শনিকরা ধর্ম আর দর্শনকে জীবনের সাথে সংযোগ করেছেন।

ছয়- কর্মবাদ

ভারতীয় দর্শনে দুঃখবাদের মূলভিত্তি কর্মবাদ। মানুষের ভাগ্য তাঁর কর্ম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। মানুষের শুভ- অশুভ, পূর্ণ- অপূর্ণ তাঁর ভাগ্য দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।